উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
সারা নারায়ণগঞ্জ, ডেস্ক নিউজ ||
"ধরবো মাছ, ছুঁইবো না কাদা"—ফতুল্লার রাজনীতিতে আলোচিত ‘শাহজাদা’ মশিউর রহমান রনি!"ধরবো মাছ, ছুঁইবো না কাদা"—নাম আমার শাহজাদা।" গ্রামবাংলার বহুল প্রচলিত এই প্রবাদটি এখন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসছে জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনিকে ঘিরে। একের পর এক সংঘর্ষ, মারধর, গুলিবর্ষণ, অপহরণ ও আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগে তার অনুসারীদের নাম উঠে এলেও এসব ঘটনায় রনির প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও অনুসারীদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার এবং ঘটনার পর নিজেকে দায়মুক্ত দেখানোর কৌশল অবলম্বন করেন তিনি। ফতুল্লার রাজনৈতিক ও স্থানীয় মহলে রনিকে ঘিরে এমন আলোচনা নতুন নয়। অভিযোগের পর অভিযোগ উঠলেও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় মামলা হওয়া, গ্রেপ্তার এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের একটি অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি বারবার আলোচনার কেন্দ্রে থেকেও আড়ালে থেকে যান। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রনি তার মামাতো-ফুফাতো ভাই, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ এবং রাফেল প্রধানের সহযোগিতা নিতেন। সে সময় সরকারি তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের প্রভাব ছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। ওই সময় রনির ইশারায় ফতুল্লার তৎকালীন ছাত্রদল নেতা শাহজাহানসহ একাধিক ব্যক্তি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।এমন ঘটনাগুলোর পর রনির ভাই রুবেল হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের রক্ষায় ভূমিকা রাখতেন বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ। নারায়ণগঞ্জের সাবেক বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকারের মাসদাইরের বাড়িতে আয়োজিত একটি দলীয় সভায় মারধরের ঘটনা নিয়েও রনিকে ঘিরে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় তৎকালীন জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি এবং বর্তমানে ফতুল্লা থানা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সাগর সিদ্দিকীসহ কয়েকজন নেতাকর্মী মারধরের শিকার হন। সাগর সিদ্দিকীকে বেদম প্রহার করে রক্তাক্ত জখম করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় রনি কে আসামী করে মামলা দায়ের ও করা হয়েছিলো। তখন রনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘আমি বাসার ভিতরে ছিলাম, বাইরে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।’ চলতি বছরের ৪ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ কার্যালয়ে একটি কর্মসূচিতে ফটোসেশনকে কেন্দ্র করে রনির সঙ্গে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতা অখিল উদ্দিন ভূঁইয়ার কথা-কাটাকাটি হয়। পরে জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদের কার্যালয়ে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।অভিযোগ অনুযায়ী, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় রনির উপস্থিতিতে তার অনুসারীরা অখিল উদ্দিন ভূঁইয়াকে মারধর করেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।ঘটনার পর রনি জেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাদেকুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা না করেই একক সিদ্ধান্তে তিনজনকে বহিষ্কার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রনি সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি ভুল-বোঝাবুঝি জনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। হামলার শিকার অখিল উদ্দিন ভূঁইয়া থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।এর আগে গত ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফতুল্লার চাঁদনী হাউজিং এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুট নামানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় রনির অনুসারী হিসেবে পরিচিত কায়েস আহমেদ পল্লব, অভি, সালাম, মনির ও জসিমসহ কয়েকজনের নাম সামনে আসে।অভিযোগ অনুযায়ী, তারা স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালান। এতে শিশু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীসহ দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন স্থানীয় বিএনপি নেতা খোকা।এ ঘটনায় রনিসহ তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা হয়। পুলিশ ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র আজো উদ্ধার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার (১২অক্টোবর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মাসদাইরের বাংলা ভবনসংলগ্ন নিঝুম আবাসিক সোসাইটির গলিতে এক যুবককে তুলে নিয়ে মারধর এবং বিসিক এলাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন রনি ও তার অনুসারীরা।অভিযোগ অনুযায়ী, সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রনির আপন ভাগিনা রিফাতের নেতৃত্বে তার সহযোগী সালাম, ব্যবসায়িক অংশীদার রোমানসহ কয়েকজন গোলাম রব্বানী নামের এক গণমাধ্যমকর্মীকে মারধর করেন। একই ঘটনায় সাগর নামের এক যুবককে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে তুলে বিসিক এলাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।ঘটনার পর গোলাম রব্বানী শিমুল প্রথমে মুঠোফোনে জেলা পুলিশ সুপারকে বিষয়টি জানান। পরে জেলা যুবদলের সদস্যসচিব রনিকেও অবহিত করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। রনি বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিলেও পরবর্তী সময়ে কার্যকর উদ্যোগ নেননি বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।পরে ওই গণমাধ্যমকর্মী আরেকজন সংবাদকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় যান। সেখানে রনির ভাগিনা রিফাতের নাম উল্লেখ করে একটি অভিযোগপত্রের খসড়া তৈরি করা হলেও সেটি জমা দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের মধ্যস্থতায় প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সাগরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সাগর বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে মামলায় রিফাতের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কেন তার নাম বাদ পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ভিডিওতে সালাম ও ভাগিনা রিফাত সহ কয়েকজন যুবককে গলির ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। পরে ছুরি হাতে সালামকে এক যুবকের কলার ধরে টেনে প্রধান সড়কের দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায় বলে ভিডিওটি নিয়ে আলোচনাকারীদের দাবি। পেছনে রিফাতকেও হাঁটতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় মহলের অভিযোগ, ঘটনার পর রনিকে জানানো হলেও তিনি কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। একই সঙ্গে রিফাতের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ এবং মামলার বিষয়ে থানায় তদবিরের অভিযোগও সামনে এসেছে। এ তিনটি বিষয় সামনে তুলে আনলেই রনির যোগসূত্র স্পস্ট হয়ে উঠবে বলে দাবী সংশ্লিষ্ট মহলের।রনি ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি প্রশাসনের একটি অংশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়েও স্থানীয় মহলে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে রনির শ্বশুড় অবসরপ্রাপ্ত জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক ওসি জহিরের কারনে নারায়নগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সর্ব মহলে রনিকে জামাই বলে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। ফলে জামাই - শ্বশুড়ের সম্পর্ক ঘিরে নানা প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ, মারধর, ঝুট ব্যবসা নিয়ে বিরোধ এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় রনির অনুসারী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে একাধিক ঘটনায় একই রাজনৈতিক বলয়ের লোকজনের নাম আসা, মামলা হওয়ার পরও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন এবং সর্বশেষ অপহরণ ও আটকে রাখার অভিযোগ—সব মিলিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, অনুসারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা হয়েছে? কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যেন অপরাধের অভিযোগ তদন্তের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তারা।রাজনৈতিক অঙ্গনে রনিকে ঘিরে ‘শাহজাদা’ উপাধির প্রচলন নিয়ে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। ‘ধরব মাছ, ছুঁব না কাদা—নাম আমার শাহজাদা’—প্রবাদটির সঙ্গে রনির রাজনৈতিক কর্মকৌশলের তুলনা টানছেন তার সমালোচকেরা। তাদের অভিযোগ, অনুসারীদের ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলেও তিনি নিজেকে ঘটনাগুলোর বাইরে রাখার চেষ্টা করেন।সব মিলিয়ে ফতুল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে মশিউর রহমান রনিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিভিন্ন ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত, কার নির্দেশনায় এসব ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, মামলাগুলোর তদন্ত কত দূর এগিয়েছে এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের বক্তব্য কী?এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তরই নির্ধারণ করবে, ‘শাহজাদা’ উপাধিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে কী তথ্য রয়েছে?